শুকনো জীর্ণ শীর্ণ শরীর ঘিরে কয়েক জনার জটলা। সত্তুর ছাড়ানো এক নারী তাঁর নয় ভাইবোনের একেবারের মধ্য সীমান্ত জনকে গলা উচিয়ে ডাকলো রীণা, হাত লাগা। নারে দিদি কিছুদিন হইল, মরা ধোওয়ালে আমার শরীর খারাপ করে। অমলি আর সূর্যিকে লগে নিছো না তাগো লইয়াই কাজ সারো দিদি। বাহির থোন আমি পানির জোগার দিচ্ছি। দ্রুত গতিতে সরে গেল সে!
মাত্র রোগে ভোগা এক মাসের শয্যাশায়ী শরীর। বয়স কম করে একশত ২-৫ হবেই হবে। এই বয়সে একমাস আগে বিছানা থেকে পরে হাড় ভেঙ্গেছে। জদ্দুপুরে হাসপাতালের চিকিৎসকরা ভর্তি নিলেন বটে। তবে সাফ জবাব, এই বয়সে আর মেরুদণ্ডে অস্ত্র চালানোর ফল ভালো হবে না। ভাই বোনেরা সবাই মিলে যুতসই আলোচনা করে শতবর্ষী নারীকে বাড়িতেই ফিরিয়ে আনে। ঘরে নাত বউ আর ছেলের ঘরে এক নাতনি পাশে থেকেছে। আদর যতন বলতে নাত বউ বাপের বাড়ির কোন আত্মীয়ের বিয়ে খেতে গিয়ে আর ফেরেনি। ছেলে গোপাল বাধ্য হয়ে সীমান্তের আগে পিছের দুই বোনকে পালা করে মায়ের পাশে থাকার জন্য আনিয়েছে। নিজের মেয়ে গার্মেন্টস থেকে ফিরে যতটুকু করে। বাকি সময় নারীর দুই কন্যা অমলি আর সুর্যি যতটা পারেন করেন।
বৃদ্ধা জাগতিক জীবনের খাওয়ার মোহ বেশ কদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছেন। এক সন্ধ্যায় জবাব বন্ধ হয়ে এলো ঘড়ঘড় শব্দ তুলে। তারপর থেকে স্বজনেরা উপদ্রবহীন জীবনের জন্য অন্ধকারের অপেক্ষায় যেন! কেননা তারাও যে নানান ঝুট জামেলায়। একজন এসেছেন সেই কিশোরগঞ্জ থেকে তো আরেকজন শরীয়তপুরে সংসার স্বামী সন্তান ফেলে এসেছেস। এরই মধ্যো বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে চারপাশে তখন টগবগে উন্মাদনা। যার যার ঘরে টিভিতে হাত পা চালিয়ে একেক জন গোলপোস্টে ঢুকে পড়ছে যেন। সাথে চিৎকার খিস্তি খেউড় শালারা খেলতে আসে নি! দর্শক হিসেবে নিখাঁদ ভক্তি থেকে ঝাড়িঝুড়িতে মুখর।
সে রাতে শতবর্ষী নারী আবারো নিরবে নিভৃতে নিঃসঙ্গতায় ঘড় ঘড় আওয়াজ তুললেন। পাশের ঘরে তখন তুমুল উত্তেজনা। হার জিতের পাল্টাপাল্টিতে বাজি ধরাধরি। আরেক পথযাত্রী জীবনের বাজিতে তখন হারতে বসেছেন। এবারো তুমুল শব্দে ঘড়ঘড়। পালা করে অমলি, সূর্যি কদিন ধরেই রাত জাগছেন। ঘড় ঘড় শব্দে মুখের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন দুবোনই! তোমার কষ্ট হচ্ছে মারে মারো? পানি, পানি খাবে বলে এক চামচে পানি মুখে ধরলে গড়িয়ে কষা বেয়ে নেমে গেল! দাদারে দাদা বলে চিৎকার করে আহাজারি অমলি আর সূর্যিদের! কি রে দাঁড়া! শেষ পাঁচ মিনিটের খেলার তুমুল উত্তেজনায় চোখ কান সবই প্রযুক্তির উৎকর্ষের স্ক্রীনে! দাদা দাদআ দেখ মা কেমন করে! এবার টনক নড়লে ঘর বোঝাই মানুষ ছেড়ে বেরিয়ে শতবর্ষীর বিছানায়। হাত ধরলেন, নাকের পথে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাত চালালেন। দেখলেন, শ্বাষের চলাচল থেমে গেছে–। সেখানে কেবলই শূন্যতা! ফুটো দুটি যেন সুর কেটে অকাজের এক গহ্বর হয়ে প্রয়োজন ফুরানোয় ভেঙ্কচি কাটছে—!
বাঁশমতি শতবর্ষীর শীর্ণ হাত দুটি নিজের মুঠোয় নিলেন। তখনে ডানহাতের কবজিতে সেই ফুলতোলা মানে “গোদনা” তোলা। হালের আমলের ট্যাটু। শতবর্ষী নারীর কবজির নিচে লেখা “রমেশ রবি দাস”! বাঁশমতির চোখের সামনে ভেসে উঠলো ঘাঘড়া পরা তরুণীকালে শতবর্ষীর পুরান কালের কত কত ছবি। রুপার টাকায় বানানো গাঁ ভর্তি গহনা পরিহিত এক তরুণী বধুর মুখ। তরুণী বাড়িময় ঘুরছে পায়ে ঘুংঘর আর কোমরে কোমরবন্দের ঝনঝন শব্দে বাড়ি মাতাল করা হাহা হাসিখুশির উচ্ছ্বাসে। তখন তিনি ৫ সন্তানের জননী। পরের গুলো আরে পরে হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাহুতে খদিত রমেশ রবি দাস লেখাটার উপর আরেকবার নজর বুলালেন। সেকালে স্বামীদের নাম মুখে আনা ছিল বারণ। আজকের বিহার বা ঝাড়খণ্ড থেকে আসা তাদের সকলের শরীরে কত রকমের যে “গোদনা-“ট্যাটু” করা হতো। খুব কষ্টসাধ্য হলেও নারী পুরুষেরা সেই নিজের শরীরে “গোদনা” করতেন দলে দলে। সেকালে ঘরের বউদের জনে জনে হাতে বাহুতে যার যার স্বামীর নাম খোঁদায় করা ছাড়াও পুরো শরীরেই “গোদনা” আঁকার চল ছিল প্রকট।
সেবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রমেশ রবি দাসের মৃত্যু হলো। তুমুল বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়ার দিন। রমেশের শেষকৃত হবো শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় ঘেষা অসাধারণ এক গ্রাম বাগেরহাটে। নদীর এক পাড়ে বাজার ঘেষা কাপাশিয়ার “আমরাইত”। আরেক পাশে “বাগেরহাট”। শতবর্ষী নারীর প্রিয় মরদ রমেশকে তার শ্বশুর মঙ্গলা বাবু বললেন, আমার বড় সন্তার ঝুমরির মরদ আমাদের আগেই জগৎ ছাড়লো—এও দেখতে হলো! যাউক, আমার ঝুমরির মরদ টাকাওয়ালা। বোঝদার ব্যবসায়ী আছিল। ধনী স্বামীর কারনে ঝুমরিকে বাপের জমিন মাটি কিছু দেই নাইক্কা। তই রমেশ রবি দাসের কবর থাউক আমাগো চোখোর লগে। আমার বাপ দাদার ভিটার জমিনে। আমি, ঝুমরির মা আর ভবিষ্যতে ঝুমরিরেও সেই ভিটের জমিনে “থান দেবার জায়গা দিয়ে যাবোনে। সেই শ্বশুরের প্রবল ইচ্ছাতে রমেশ রবি দাসের থান হলো শীতলক্ষ্যার পাড়ে ছায়াঘন অবারিত এক মুক্তাকাশের নিচে।
বাহিরে উচ্চস্বরে আওজা, হাঁকডাঁক। দাদা বড় বোনরে বারে বারে জিগায় আত্মীয়রা জানবার চাই কোথায় যাবে তারা। শেষ যাত্রা বলে কথা। দূর দূরান্তরের স্বজন পরিজনেরা পরিমরি করে ছুটে আসছে শেষবার এক নজরে দেখবার। পিপুল-বিপুলেরা কি কয়? কি আর কবে, হবে না বলছে– মানে! এতকাল পরে এই কথা। জীবন থাকবার কালে পিসিরে কেন একবারও কইলো না পিসি “আমরাইতের” আশায় থাইকো না। তুমার স্বামী, বাবা মায়ের পাশে জায়গা দিবার পারছি না। তই শতবর্ষী তো জেনে গেলেন প্রিয় মরদ “রমেশ রবি দাসের”পাশেই তার থান হচ্ছে। একবারও শতবর্ষীকে কেহ মুখ ফুটে বললো না! “ঝুমরি পিসিকে বাপের ভাগের জমিন না দিয়ে মরণের পরে সাড়ে তিন হাত জমিন দিবার ওয়াদা করে গেছে পিপুল_বিপুলের বাপ দাদারা। কিভাবে
আজ চোখ পাল্টি দিলরে?
সারা জীবন বাপ ভাই বোনদের বুকে করে আগলে রেখেছিল সেই মধ্যবর্তী সীমান্তের সন্তান এবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো! আগেই পণ করা ভাই বোন কারো মধ্যে আগ বাড়িয়ে কিছুতেই মাথা দেবে না আজ। সব করবে হাতে পাতে কাজ করবে মাথা দেবে অথচ তারপরেও তার দোষের তো সীমা পরিসীমা থাকে না। বাড়িভরা গমগম স্বজনের উপস্থিতি। উঠানে মরদেহ তখনো সাড়ে তিন হাত জমিনের অনিশ্চিয়তা!
বাধ্য হয়ে, মুখ খুললো, বললো, থাউক দাদা মরা ঘরে রেখে কাইজ্জায় যাইস না। রাজবাড়ির পিছে গণকবরে খোঁজ লাগা। নানা-মামাদের বহুকাল আগেই বলা হয়েছিল ডুকুমেন্ট করে লিখিত পড়িত ভাবে মজবুত করে মায়ের শেষ থানের জায়গাটা দিয়ে যান৷ সেকালের মানুষ ওয়াদার বরখেলাপ হবে না এক কথা মানে এক জবান। একালে সেই জবানের কোন দাম নাইক্কা। যাউক কোনে একান্তই গোরের জায়গা না পেলে শীতলক্ষ্যায় ভাসিয়ে দিবি আর কি করা। দাদা খানিক হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন! এবার জিগালেন যারা পথে তারা যে জিগায় কনে আসপে? তোমার বাসায় আইতে কইয়া দাও। পরেরটা সময়ের আগে পরে বলবা নে পরিস্থিতি বুঝে।
ষাট উধ্বোর্ধ মানুষটি নতুন উদ্যোমে পথের নতুন দিশায় ছুটলো যেন। তাকে আজ মনে হচ্ছে সদ্য তরুণ। নয় ভাইবোনের সেতুতে দাঁড়িয়ে পরিবারের সবচেয়ে দায়িত্বশীল মায়াবী অকালে বৈধব্যের শিকার যে নারীটা নিজের যত সামান্য উপার্জনে ভাই বোন মাকে বুকে আগলে রেখেছিল বরাবর আজ সেই নারী যেন স্পাত কঠিন। কান্না নেই, রোবটের মত ঘুরে ঘুরে যেখানে প্রয়োজন তার সবই বাতলে দিচ্ছে। কিন্তু আগের মত সেই আবেগের ঘণঘটা নেই। দুঃখের পাহাড় বয়ে নীরবে নিভৃতে নিঃসঙ্গতায় সবখানে গ্যাপ পূরণ করে যাচ্ছে। তার শরীর গরম কানে ঝাঁ ঝাঁ শব্দ, মুখ নাক দিয়ে গরম বাতাসের হল্কা! তথাপিও সেই নারীটি মায়ার বুননে পুরো পরিস্থিতিতে নজর রেখে উপস্থিত বুদ্ধি পরামর্শের তালি দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে চলেছে। শেষ বিদায়ের যাত্রা, কোন গ্যাপ রাখা যে চলবে না।
এর মধ্যে কে একজন উত্তেজনা নিয়ে হাজির। গণকবরে ঠাঁই হতে পারে, তবে কিনতে হবে জমিন! কিনতে হবে কত কত লাগবে রে দাদা! দশ-বিশ হাজারের কম না। আরেক জন্য এসেই বলছে বাঁশ কিনবো টাকা দাও। ওহ টাকা, টাকা লাগরে শেষ যাত্রার বাহন! বাঁশের খাঁচিতে সজ্জিত হবে শেষ ঘুমের আয়োজন। পাশের কে একজন এগিয়ে আসলেন ধীর পায়ে। পরিচয় দিলেন আমি অমুক আপনাদের প্রতিবেশি। আমার ঝাড় থেকে কটা বাঁশ কাটতে পারেন! মাসিমা আমাদের গ্রামের বউ তার সামনে আমরা বেড়ে উঠেছি। কত স্মৃতি কত ঘটনার স্বাক্ষী তিনি!
এখন সামনে সাড়ে তিন হাত জমিন কেনার ঝক্কি৷ বাঁশমতি, বাসন্তি, বীণা, গোপাল আর মধ্যের সেতু সন্তান রীণার পরে সূর্যি, অমলি, সুধীর ও কনীকা যার যার স্বামী স্বজনদের বাইরেও শতবর্ষীর নাতি পর নাতির তিন চার প্রজন্মের উপস্থিতি। সঙ্গত কারনেই টাকা জোগাড়ে সমস্যা হলো না বটে৷ তবে কথার বরখেলাপে থম ধরে আছে পুরো বাড়ি। এমনিতেই ভাঙ্গনের সুর। সেই সূতোর টানে আজই বিচ্ছিন্ন হবে যেন সকল বন্ধন। এতদিন এক শতবর্ষী নারী কালের খেয়া হয়ে যেন পথ আটকে ছিলেন। যাই, যাচ্ছি করেও আটকে ছিলেন গলায় বেকায়দার আটকে পরা কৈই মাছের কাঁটা হয়ে। তারপরও নয় সন্তান, তাদের ঘরে ঘরে বাড়ন্ত প্রজন্মের নাতিপুতি পরের ঘরের পুতিরা শতবর্ষী নারীর হঠাৎ হঠাৎ অসুস্থতার অজুহাতে মিলিত হতেন। এবার সেই মিলন মেলার উপলক্ষ–বিদায় বেলা। যে যেভাবে পারছে সামিল হবার আপ্রাণ চেষ্টায়। সমস্যার জট পাকছে কিভাবে যেন খুলেও যাচ্ছে!
বাঁশমতি তাঁর মায়ের শরীরে পানি ঢালছে, তো ঢালছেই! আর ঘষে মেজে পরিস্কার করে শতবর্ষের শত ছিন্ন একেকটি দিনের একটি একটি করে স্মৃতির ফাঁদে পরছে বেচারা। পর্দার বাইরে থেকে পানির জোগান দেওয়া রীণা ডাকছে ওহ দিদি আর কত ধুইবা হয় নাইক্কা! রীণা অমলি, সূর্ষি এই তো হলো বলে আর একটু বলে হাঁক ছাড়েন। পর্দার ওপার থেকে আলাপ তোলে আরেক জন, দিদি তোমার কি মনে পরে মা কেমন উল্টো দিকে আঁচল নিয়ে শাড়ী পরতো। পরবে না সবই মনে পরছে রে! আর রুপোর কাঁচা টাকার গহনার সাথে ঘাঘরা_চুলি পরে খুব যে পাড়া বেড়াত মায়ে? হ্যাঁরে পরছে সব সবই। চোখের সামনে এই তো সেদিনের কথা সব!
ছেলে মেয়ে নাতি ও নাতিনের বরেরা এসেই হাঁকছে সাজানো গুছানো হলো হলো বলে! বাঁশমতি খানিক বিরক্ত হয়ে বলে এত তাড়া কেন রে এই তো শেষ দিন। না না পিসি সন্ধ্যার আগে আগেই সম্পন্ন হলেই ভালো না! তখনো চলে শেষ যাত্রার সাজসজ্জা। এক কন্যা আতর দেন তো আরেক কন্যা খানিক চোখের কোনার কাজলটা আরেকবার টেনে আরো খানিক গাঢ করে৷ আরেক নাতি চন্দনের টিপটা আরো খানিক বড় করে আঁকে।
রীণা আর বাঁশমতি একে অন্যকে বুকের মধ্যে গছিয়ে ধরে। বাঁশমতি কাকে যে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো, মায়ে তো বাপুর পাশে থান পেল না রে রীণা। বাপু আর বাপুর বাপেরা দাদারা আছিল গৌরতপুর বালিয়া জিলার বালিয়া থেকে। ভোজপুরি ভাষায় কথা কইতো। মায়ে আছিল আসামের। মৃত্যুকালেও দুজনের পথ দুদিকেই গেল রে রীণা বলেই ঢুকরে কেঁদে উঠলেন সত্তুরউর্ধ্বো বাঁশমতি।
রবি দাসরা ঐতিহাসিক ভাবে শূদ্র বা অন্তজ্য মানে নিম্নবর্ণের শ্রেণীভুক্ত। সেই মধ্যযুগে ভক্তি আন্দোলনের নামে এই রবি দাসরা সনাতন সমাজের এত এত জাত পাতের বিরোধিতা করে আন্দোলন করেছে। এর জনক বা গুরু রবি দাস ছিলেন মহান এক সন্তু বা সাধক একই সাথে কবি। জাত পাতের ঘৃণা থেকে মানুষের মুক্তির জন্য মানবের সমতা, মানুষে_মানুষে মানবিকতার প্রচার করে এই রবি দাস জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ গুরু রবি দাস। শতবর্ষী ঝুমরি সেই রমেশ রবি দাসের প্রিয়তমা হয়েও গণকবরে যাচ্ছে শেষ বিদায়ের আশ্রয়ে। বাঁশমতি মায়ের বাহুতে খোঁদায় করে সেই ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু একেবারে বুঝো আসা সেই “গোদনা” বা “ট্যাটু” করা রমেশ রবি দাস লেখা বাহুখানি শেষবারের মত দুহাতে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গভীর চুম্বনে আঁকড়ে রইল! সূর্যি, অমলি, গোপাল, সুধীর আঁকুল হয়ে ডাকলো দিদি দিদি, ছাড় মাকে যেতে দে!
রমেশ রবি দাস ছিলেন সৌখিন পুরুষ! ঘরের লক্ষীকে ঘাঘরা চুলিতে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতেই পচ্ছন্দ করতেন। ব্যবসায়ী রমশে প্রথাগত ভাবে রবি দাস যাদের মূল পেশা ছিল চামড়ার সাথে মাসে চর্মকার। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ক্রয় করে সাইজ শুকানো পলিশ করে জুতা বানানোর সেই কাজে তিনি যান নাই৷ বরং ব্যবসা করে জমিন কেনেন বিঘত বিঘত জমিন। ঝুমরির বাপেরা থানিও (স্থানীয়) হওয়াতে শীতলক্ষার এপার ওপারে জমিনের কোন অভাব ছিল না। সেই ঝুমরির বাপুর মৃত্যুর পরে তার ছেলেরা, ভাইয়ের পুতেরা ঝুমরিকে বাপুর জবান দেওয়া জমিনে শেষ বিদায়ের “থান” দিল না! বিষন্ন সন্তান স্বজনদের কেউ কেউ নিরবে নিভৃতে শতবর্ষী ঝুমরির গোরস্থানে নিঃসঙ্গতার সঙ্গী কে হবেন সেই বেদনায় কাতর।
গোপাল, সুধীর সব পুরুষেরা আবারো তাড়া দিচ্ছে হাঁকেডাকে তোড়জোড়ে। রীণা বীণা, অমলি, সূর্ষি বড় বোনের হাত থেকে আলগা করলো শতবর্ষীর বাহু। রমেশ রবি দাস লেখা বাহুখানি খাটিয়ার পাশে সযতনে সাজিয়ে গুছিয়ে ঠাকুরের কাছে শেষ প্রার্থার আয়োজন করতে অনুরোধ করলেন। মায়ের সীমান্তের মধ্য রেখায় দাঁড়ানো সন্তান রীণা বুকের কাছে সযতনে রাখা নিজ হাতে লাগানো গাছের একগাছা বেলি ফুলে টেনে আনলো ব্লাউজের নিচ থেকে। সবার অগোচরে তুমুল ঘ্রাণময় পাতাসমেত বেলি ফুলের গোছাটা শতবর্ষী নারীর কানের পাশে গুঁছে দিলো। সম্পন্ন হলো শতবর্ষী নারীর শেষ বিদায়ের সাজসজ্জা। তারপর আর এক মুহূর্ত দাঁড়লো না সে।
বেরিয়ে যাবার আগে, শুধু বিরবির করে যেন বাতাসের উদ্দেশ্যেই উচ্চারণ করলো–“মায়ের বাপুর আছিল “কাপাশিয়ার আমরাইতে” বিঘত বিঘত জমিন। আর শীতলক্ষ্যা পাড়ে বাপু_মায়ের ভরা সংসার সমেত বাগেরহাটে আছিলো বিঘা কতক জমিন, লেবুর বাগান আর নারকেলের বন! সেই মায়ের শেষ ঠিকানায় নিজের বাপু কিংবা স্বামীর স্মৃতিবহ গ্রাম “আমরাইতে” সাড়ে তিন হাত জমিন জুটলো না? রীণা খুব দ্রুত হনহন করে হেঁটে চললো নিজের গন্তব্যে! তাঁর শরীর কাঁপিয়ে গরম শ্বাষ! গরম চোখের পানিও! প্রবল কাঁপুনিতে তার জ্বর নামছে! হরি হরি করে শতবর্ষীর খাটিয়া তুললো বাড়ির পুরুষেরা। কিন্তু একবারো পিছনে সে ফিরলো না! দেখলো না শতবর্ষী নারীর শেষ বিদায়ে যাত্রায় আর কারা কারা সঙ্গী হলো? মাত্র সাড়ে তিন হাত জমিনের জন্য গণকবরে থান পেতে খুব তাড়ায় কিভাবে ছুটছে তারই প্রিয় সব স্বজনেরা।
শুভ রাত্রি, ঢাকা ডায়েরি ৭ আগষ্ট ২০২৬.
#ছোটগল্প_সাড়ে_তিন_হাত_জমিসদন
#জান্নাতুল #বাকেয়া #কেকা
#fb #fbpost #myclick #ছোটগল্প




Discussion about this post