ভাষা সংগ্রামী শিক্ষাবিদ প্রতিভা মুৎসুদ্দিকে যতটা জানিঃ
একজন প্রতিভা মুৎসুদ্দি! তাঁর মত কর্মদীপ্ত_প্রাণোময়_স্বপ্নচারী_ব্যক্তির সাথে কথা বলা মানে ইতিহাসের বাঁকে এক অনন্য স্বাক্ষীর সাথে দার্শনিক সফরে যাওয়া। শত শত আলোকবর্ষের এই বিপুলা বিশ্বে আপনিই আমার অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা!
ক.
অপার শ্রদ্ধা প্রতি মুৎসুদ্দি! ভাষা সংগ্রামী ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ। শৈশবে বৃিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে কয়েক দফা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে সেই ১৯৪৮_ প্রথম পর্যায়ে দানা বাঁধার সময়কাল থেকে চূড়ান্ত পর্বের সেই ১৯৫২ এবং ১৯৫৬ এ সমাপনী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে ছিলেন ওতো প্রতোভাবে। তাঁকে নিয়ে লিখতে গেলে নারী অধিকার নিপীড়িত ও পিছিয়ে পরা নারীদের এগিয়ে দেওয়ার কতক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করা জরুরি। নারী শিক্ষা জীবনমুখী ধারায় নারীদের এগিয়ে দেওয়ার সাথেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা ও নিবিড় যোগসূত্রতার কথা উল্লেখ করতেই হয়। আমার গবেষনাধর্মী গ্রন্থ “ভাষা আন্দোলনের সাত দশক জানাঃ অজানা”য় তাঁকে নিয়ে লেখা আছে। সেই সময় তিনি তাঁর দুহাত বাড়িয়ে আমাকে তাঁর জীবন, কর্ম, সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পরা বাদেও বৃটিশ বিরোধী মজনে ভারত ছাড়তে বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের কত কত অজানা কথার ঝাঁপি মেলে দিয়ে অসম্ভব রকমের সহযোগিতা করেছেন! তাঁর সেই স্নেহ ও ভালোবাসার ঋণ কখনোই শোধ হওয়ার নয়।
খ.
তথাপিও আমার তরফে আরো মর্মবেদনা তা এই যে, আমি তাঁকে তাঁর কর্ম অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আঁধার কাটানো আলোকবর্তিকা হয়ে উঠার এক অনন্য জীবনের সবটাই গাঁথতে পারি নাই। তাঁকে বৃহৎ ও যথা উপোযুক্ত পরিসরে উপস্থাপন করতে পারি নাই। একজন কর্মে নিবেদিত প্রাণ নারী, একজন শিক্ষাবিদ যিনি নিভৃতচারে সমাজ সংস্কারে আজীবন চারপাশের আঁধার কাটিয়ে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন। আজঁ ছড়াচ্ছেন যদিও বয়সের ভারে খানিক নুজ্য হয়ে পরেছেন। তথাপিও থেমে নেন তিনি!
গ.
এই গুণি নারীর জন্ম ১৬ ডিসেম্বর ১৯৩৫ সালে। যিনি এক জীবনে বৃিটিশ শাষণ শোষণের বিরুদ্ধে সেই শৈশবে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থী কালেই শ্লোগানে মুখর হয়ে ছিলেন। তিনি দেশ ভাগের যাতনায় প্রিয় বন্ধুর সাথে বিচ্ছেদ, পাকিস্তানের দীর্ঘ দুই যুগের শাসন_শোষণ, বৃটিশদের বাইরে সমগোত্রীয় স্বধর্মীয় জ্ঞাতি ভাই পাকিস্তান উপনিবেশিক আমল দেখেছেন। সর্বপরি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের গৌরবময় মাহাত্ম্য ও এর পরের নানান উত্থান পতন নব্বইয়ের গণআন্দোলন সবই দেখেছেন তিনি। আমার দুর্ভাগ এতবড় এক গুণিজনের কাছে যাওয়া তাঁর স্নেহের অপার ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়েও তাঁকে ঘিরে আমার স্বপ্নের কতক কাজের সবটাই গুছিয়ে করতে পারি নাই। এই আক্ষেপ আমার শেষ হবার নয়।
ঘ.
নির্মোহ_নির্লোভ_নিরহংকার_ত্যাগি সাদামাটা জীবনের অনন্য মহত্ত্বের এক বিরল সত্তার নারী! প্রতিভা মুৎসুদ্দি তিনি চিরকালই নাম যশ, খ্যাতি এবং প্রচারের বাইরে থেকেছেন। কোন ধরনের আত্ম প্রচারের বাইরে কী যে নীরবে নিভৃতে নিজের ঐশ্বরিক জীবনের এতটা কাল কাটিয়ে গেলেন নিজেকে সব ধরনের লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেই। তাঁর কাজ কর্মের মোহ আর জীবনবোধের গভীরে যে নিস্তব্ধতা ও তরঙ্গায়ীত ছন্দ, মহৎপ্রাণ আনন্দের অপার উচ্ছ্বাস তা তিনি আগলে রেখেছেন বটে! তবে তাঁর চরিত্রের এতসব ছন্দের সুরোলোলিত আবহ সবখানেই আঁধার কাটিয়ে আলো ছড়িয়ে আলোকিত ই করেছে।
ঙ.
কর্মেক্ষেত্রে তাঁর অনন্য ছোঁয়ায় এক জীবন্ত কিংবদন্তি প্রতিষ্ঠান দেশের স্বনামখ্যাত ভারতেশ্বরী হোমস! সেখ্যাতি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে ভিন্নদেশে বর্হিবিশ্বেও পৌঁছেছে। সবচেয়ে দীর্ঘকালের অধ্যক্ষ হওয়া অনন্য গৌরবের নজির গড়েছেন তিনি! দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার আমন্ত্রণে যে নারী একজন অর্থনীতির শিক্ষক–প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন, তিনিই সময়ে কালে হয়ে উঠেন ভারতেশ্বরী হোমসের প্রাণ। সবচেয়ে বেশি সময়কালের অধ্যক্ষ পালনকারী এক শিক্ষাবিদ। সেই ১৯৬৫ সালে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এই গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। ইতোমধ্যে তাঁর দায়িত্বকালে “ভারতেশ্বরী হোমস স্কুল এবং কলেজ পর্যায়ে দেশসেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যদা পেয়েছে। তিনিও পরিণত হয়েছেন নারী শিক্ষা প্রসারের অনন্য এক আলোকবর্তিকায়। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর কাজের অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ২০০২ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা “একুশে পদক”এ ভূষিত করা হয় মহীয়সী এই নারীকে। এছাড়াও প্রবীণ গুণি এই শিক্ষাবিদকে ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি সম্মান সূচক ফেলোশিপ প্রদান করে সম্মানিত করে।
চ.
একজন প্রতিভা মুৎসুদ্দিকে এক কথায় তুলে ধরা খুব সম্ভব নয়। তাঁর মত মহীয়সী নারী এর চেয়েও বড় তাঁর মত কর্মবীর উদ্যোমী, আত্মবিশ্বাসী, প্রাণ_জাগরণের অনন্য ব্যক্তিত্বের স্বরুপ সামান্য তুলে ধরা যায়, তাঁর সবটাই নয়। তখাপিও স্নেহ ঋণে আমি তাঁর কাছে আবদ্ধ হয়ে কাছে গিয়ে একান্তে বসে আলাপচারিতার সুযোগ পেয়েছি। তবে আমার পরিকল্পনামত তাঁকে বৃহৎ পরিসরে উস্থাপন করতে না পারার বেদনায় আমি জর্জরিত। আমাদের সামনে তাঁর মত মহীয়সী গুণি উদ্যোমী নির্লোভ নির্মোহ ব্যক্তি চরিত্রের দেখা মেলা ভার আজকাল আর নেই বললেই চলে। কেননা শতাব্দীকালে এমন কর্মময়ী নিবেদিত প্রাণ মির্মোহ ব্যক্তিত্বের সহসায় জন্ম হয় না। সুতারং নয়া প্রজন্মের কাছে তাঁর মত এক যুগ সন্ধীক্ষনের স্বাক্ষী শতাব্দী কালের বিরল এক ব্যক্তিত্ব এক জনই আসেন। সেই বিরল ব্যক্তিত্বকে স্বরুপের সম্পূর্নভাবে তুলে ধরে দৃষ্টান্ত করাটা খু্বই জরুরি। আর যদি তা আমরা করতে না পারি তবে তা হবে আমার_আমাদের অমোচনীয় এক ব্যর্থতা ই বটে।
ছ.
সেই ব্যর্থতার দায় নিয়ে ভগ্ন মনোরথে বলি একেক জন রাষ্ট্র নায়ক হয়ত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করেন বা করতে পারেন। তবে একজন প্রতিভা মুৎসুদ্দির মত নির্মোহময়, উচ্ছ্বল মুক্ত আলোকিত মানুষেরা সমাজের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলেু বদলে যেত সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তবতা। বদলে যেতে পারতো এই কালের সমাজ_রাজনীতিক_ব্যক্তি রাজনীতিক তরুণ তারুণ্যের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাও। আমাদের রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, সাফল্যের আজ_কাল_আগামী_সর্বকালেই সমালোচনা করতে পারি বটে। তবে এই সমাজ ও সমাজবদ্ধ চারপাশের নিয়ন্ত্রণ যখন এমন কারো_কতকের হাতে চলে যায় যখন আলোর প্রক্ষেপনে আলো ছড়াতে পারে না! বরং আলো সরিয়ে অন্ধকারের যাত্রায় নিমজ্জিত হয় সমাজ ও সমাজবদ্ধ সকলে। এইকালের ভোগী_লোভী_উচ্চা ভিলাষী_সুবিধাবাদী_নাগরিকেরা নিয়ন্ত্রণ নেয় আমাদের সমাজের। তাদের নিয়ন্ত্রণে গিয়ে সমাজ চলে যায় রসাতলে। ফলে একজন আলোকবিন্দু প্রতিভা মুৎসুদ্দির ছড়ানো আলো ক্রমশ নিশব্দে ঘন ঘোর আঁধারের অতলে পথ হারায়। আর আমি আমরা কতকেরা অসহ্য যাতনায় নিরবে নিভৃতে_নিঃসঙ্গতায় সেই ঘোর আঁধারে হারিয়ে যেতে থাকি! হারাতে দেখি এক শতাব্দীকালে একবারই জন্ম নেওয়া মহতী এক চরিত্র প্রতিভা মুৎসুদ্দির মত কালজয়ী ব্যক্তিত্বকে৷
জ.
অপার শ্রদ্ধায় বিনম্র চিত্তে নিরন্তর ভালোবাসা জানায়। আজ হঠাৎই প্রিয় গুণিজন সংগ্রামী বিপ্লবী অনুকরণীয় অনবদ্য চরিত্রের মহতী ব্যক্তিত্ব প্রতিভা মুৎসুদ্দি আপনাকে মনে পরেছে সারাটা দিনমান৷ তাই সত্যিটা আজ বলি আপনাকে আলোকবিন্দু ধরেই ঘুরতে চাই শত শত আলোকবর্ষী এই বিপুলা বিশ্বে। আপনি আমার শত সহস্ত্র সালাম ও শ্রদ্ধা নেবেন গুণিজন।
——-
- ১৮ আগষ্ট ২০১৬.
